স্টাফ রিপোর্টার আরাফাত হোসেন

ছিলো শতবর্ষী পুরাতন পুকুর, বালি দিয়ে ভরাট করে হয়ে গেল বিক্রি উপযোগী প্লট। কুষ্টিয়া শহর সংলগ্ন ফুলতলা বড় পুকুর নামের একটি ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী পুরাতন পুকুর শতাধিকের বেশি ট্রাকে করে বালি এনে প্লট আকারে বিক্রির জন্য স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ভরাট করেছে, অভিযোগ স্থানীয়দের।

আইন লংঘন করে দিনে দুপুরে দীর্ঘদিন ধরে ভরাটের কর্মযজ্ঞ চলেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীরা। তবে সদর উপজেলা প্রশাসন, সহকারি ভূমি কমিশনার, ও পৌর কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে কিছুই জানে না, এমনটি জানিয়েছেন তারা এই প্রতিবেদকের কাছে। অথচ নির্দেশনা আছে পুকুর ফসলি জমি ভরাট বন্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

জানা গেছে শতবর্ষী বড় পুকুরটি কুষ্টিয়া জেলা শহরের চৌরহাস ফুলতলা সংলগ্ন এলাকায় বড় পুকুর নামে দীর্ঘদিনের পুরাতন পুকুর এটি। এই পুকুরটির নাম অনুসরণ করেই ওই এলাকার নামটি হয়েছে বড় পুকুর এলাকা। শহরের যে কোন প্রান্ত থেকে রিকশা বা যাতায়াতের জন্য ঠিকানা বলতে গেলে বড় পুকুর নামেই সবাই চেনে ওই স্থানটাকে। পুকুরটি প্রায় ২০ বিঘার উপর নির্মিত ছিলো। অগ্নিকান্ডে পানির অন্যতম উৎস হতে পারে এটি, তবে বেশ কিছু বছর ধরে সুকৌশলে অল্প অল্প করে পুকুরটি ভরাট করেছে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে।

স্থানীয় সূত্র মতে এই পুকুরটি শতবর্ষী পুরাতন এবং এই পুকুরটির সাথে শহরের ইতিহাস ঐতিহ্য জড়িত আছে। এই এলাকার নামকরণ হয় এই পুকুরটিকে ঘিরেই। কিন্তু বিগত ৮-১০ বছর ধরে পুকুরটি ভরাট করা হয়েছে, অল্প কয়েক মাস হলো পুকুরটি ভরাট কার্য সম্পন্ন হয়েছে । এখন সেটি প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে।

ওই এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন বলেন, পুকুরটি ভরাট হয়েছে স্থানীয় (১৯) নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মীর রেজাউল ইসলাম বাবু ও স্থানীয় শহিদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনের সমন্বয়ে। কিন্তু তারা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ এই পুকুরটি নির্দেশনা না মেনে ভরাট করা হয়েছে, যা আইনের পরিপন্থী। তারা বলেন এই পুকুরটিতে সারাবছর প্রবাহমান পানি থাকতো, এটি কোন মরা পুকুরও না, কিন্তু এটি ক্ষমতার জোরে ভরাট করা হয়েছে। এই পুকুরটির প্রকৃত মালিক মনোরঞ্জন পাল নামের এক হিন্দু ব্যক্তির। শোনা যায় যুদ্ধের বছর তিনি দেশ ত্যাগ করে ইন্ডিয়াতে চলে যান আর ফিরে আসেননি। তার নাম কিভাবে পরিবর্তন হয়েছে সেটি নিয়েও জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরটি ভরাট করে সমান্তরাল করা হয়েছে, সেগুলো এখন প্লট করে বিক্রি করা হচ্ছে। জমি ক্রেতারা সেখানে তাদের নিজস্ব প্লটগুলো ৮ থেকে ১০ ফিট ইটের গাঁথুনি দিয়ে বাউন্ডারি করে রেখেছে।

এমনই এক বাউন্ডারিতে ক্রয়সুত্রে, ক্রেতার নাম লাজমিন রহমান এবং মোবাইল নাম্বার সাইনবোর্ডে দেওয়া থাকলে, সেই নাম্বারে যোগাযোগ করে জানতে যাওয়া হয় জমি বিক্রেতার নাম, কতো করে কাঠা কেনা হয়েছে, এবং নাম খারিজ হয়েছে কিনা এগুলো জানতে চাইলে তিনি বলেন এই জমির মালিক আমি না, আমার মেয়ে কিনেছে তাই বিস্তারিত আমি কিছুই জানিনা। বিষয়টি এভাবে তিনিও এড়িয়ে যান।

এই ব্যাপারে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাবুর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, এই পুকুরটি অনেকদিন আগে ভরাট করা হয়েছে তখন এটি পৌরসভার ওয়ার্ডের মধ্যে ছিলো না, যার কারনে অনুমতি নেওয়া হয়নি, এছাড়াও তিনি বলেন এই ব্যাপারে আমি ভালো বলতে পারব না, শহিদুল ভালো বলতে পারবে।

শহিদুলের কাছে ওই জমির প্লট কিনতে চাইলে তিনি বলেন, জমি সবই বিক্রি হয়ে গিয়েছে, সাংবাদিক পরিচয় জানার পর, পুকুর ভরাটের অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে? এটি অনেক বছর আগে ভরাট করা হয়েছে, তখন এসব আইন ছিলো না। তিনি বলেন এই ব্যাপারে ওয়ার্ড কমিশনার বাবু ভালো বলতে পারবেন।

তারা দুজনেই দুজনকে দেখিয়ে দেয় ভালো বলতে পারবেন বলে, এবং এভাবেই ব্যাপারটি এড়িয়ে যায় এই প্রতিবেদকের কাছে।

আইনে আছে পুকুর ভরাট করতে হলে পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তনসহ জলমহালের তালিকা থেকে বাদ দিতে হয়। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বেআইনি। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি।

কোনো ব্যক্তি এই বিধান লঙ্ঘন করলে আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্থ প্রতিম শীল এর সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, এই ব্যাপারে স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে।
কুষ্টিয়া সহকারী ভুমি কমিশনার দবির উদ্দিন বলেন, এই পুকুর ভরাটের কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি, অভিযোগ আসলে আমরা ভরাট বন্ধের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি, এটা আইন লঙ্ঘন করে করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া পৌরসভা নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের সাথে কথা বলে তিনি বলেন এই পুকুর ভরাটের ব্যাপারে পৌরসভা থেকে কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি।